কালেম পাখির কথা

ওদের প্রথম কবে দেখেছি, মনে করতে পারছি না। তবে বুনো অবস্থায় মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, ঢাকার কেরানীগঞ্জের কোন্ডার চর ও রাজশাহীর মোহনপুরের বিলে দেখেছি ঝাঁকে ঝাঁকে। মুরগি আকারের পাখিগুলো ভালো পোষ মানে। তাই একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুষতে দেখা যেত। এমনকি এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে পোষা পাখির খামারিরা ওদের খামার ভিত্তিতে লালনপালন করেন বিক্রির জন্য। অথচ বাংলাদেশের প্রচলিত বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে বন্য প্রাণী ও পাখি পোষা এবং বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

 

 

 

 

মহামারি করোনার আগে সিলেটের টিলাগড়ে ওদের তিনটিকে পোষা মুরগির মতো ঘুরে বেড়াতে দেখে গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে তুলতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্নেহাস্পদ আতিকুজ্জামানকে বললাম, ‘বাহ, এ রকম পাহাড়ি এলাকায় বুনো এই পাখিগুলো কী নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দারুণ লাগছে!’ উত্তরে অধ্যাপক আতিক বলল, ‘স্যার, ওরা কোনো বুনো পাখি নয়, এখানকার একজনের পোষা।’ ওর কথা শুনে থ বনে গেলাম! বন্য প্রাণী সংরক্ষণের এই যুগে মানুষ কীভাবে বুনো পাখি পোষে, ভাবতেও পারি না।

 

 

 

একবার ফেনীর মুহুরী সেচ প্রকল্পে বার্ডিংয়ের সময় একটি পাখি আমাদের নৌকার ঠিক সামনে এমনভাবে লাফ দিল যে ক্যামেরায় ক্লিক করতে মুহূর্তও দেরি করলাম না। ওরা এভাবেই দৌড়ে, লাফিয়ে, উড়ে এ দেশের জলজ পরিবেশকে মাতিয়ে রাখে। কামনা করি, মানুষের শখ ও জিবের লালসা থেকে মুক্ত থেকে প্রকৃতিকে এভাবেই মাতিয়ে রাখবে ওরা।

মুরগির মতো সাহসী পাখিগুলো এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি কালেম। কায়েম, সিয়া কুকরা, বুরি, কামপাখি (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম গ্রে-হেডেড সোয়াম্পহেন। যদিও এর আগে ওরা পার্পল সোয়াম্পহেন, পার্পল মুরহেন বা ইন্ডিয়ান পার্পল সোয়াম্পহেন নামে পরিচিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে পার্পল সোয়াম্পহেনের ছয়টি উপপ্রজাতিকে ছয়টি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ করা হয়েছে। রেলিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Porphyrio policephalus। বাংলাদেশ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে চীনের উত্তরাঞ্চল হয়ে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত ওরা বিস্তৃত।

 

 

 

প্রাপ্তবয়স্ক কালেমের দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৫০ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৯০-১০০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৭০০-৮৫০ গ্রাম। একনজরে দেহের পালক চকচকে নীলচে-বেগুনি। মাথার রং হালকা। ঘাড় ও বুকে চকচকে ভাব আছে। লেজের তলা সাদা। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও কপালের ওপরের লাল বর্মটি স্ত্রীর ক্ষেত্রে ছোট। চোখ ও চঞ্চু লাল, চঞ্চুর আগা ফ্যাকাশে। পা লম্বা; পা, পায়ের পাতা ও আঙুল রক্ত-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি অনুজ্জ্বল, গলা ফ্যাকাশে এবং মুখ, ঘাড় ও বুকে ধূসর আভা রয়েছে।

 

 

 

কালেম হাওর, হ্রদ, বিল, নলবন ও ঘেসো জলাভূমিতে পাখিগুলো বিচরণ করে। দিবাচর পাখিগুলো মাঝারি থেকে বড় দলে ঘুরে বেড়ায়। ধীরে হলেও ভালো উড়তে পারে। ওরা অত্যন্ত বদমেজাজি এবং মারামারিতে ওস্তাদ। ভোরবেলা ও গোধূলি ছাড়াও বাদলা দিনে বেশ সক্রিয় থাকে। অল্প পানিতে ভাসমান আগাছায় হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদ, বীজ, শস্যদানা, শিকড়, খোলকযুক্ত প্রাণী, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি খায়। ‘চাক-চাক-চাক…’ শব্দে ডাকে। প্রজননকালে ডাকে ‘কিরক-কিরক-কুরাহ…’ শব্দে।

 

 

 

এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি ঘন ঘন ডাকে। স্ত্রী-পুরুষ একত্রে মিলেমিশে জলজ উদ্ভিদ-গুল্ম বা ঝোপের ভেতর লতাপাতা, শিকড় ইত্যাদি দিয়ে বিশাল বাসা বানায়। স্ত্রী তাতে তিন থেকে সাতটি বেগুনি ও বাদামি ছিটযুক্ত চকচকে হলুদ বা ফ্যাকাশে রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ১৮-২৩ দিনে। সদ্য ফোটা ছানাগুলো কুচকুচে কালো। বয়স চার-চার দিন হলেই ছানারা মা-বাবার সঙ্গে বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল প্রায় পাঁচ বছর।

Leave a Comment

Your email address will not be published.